নদী, নগরী ও ইতিহাস-ঐতিহ্যে মোড়া ময়মনসিংহের গল্প
রিকমা আক্তার:
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা এক ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ শহর ময়মনসিংহ। শতাব্দী পেরিয়ে আসা এই নগরী বহন করে নানা জানা-অজানা কাহিনি, প্রাচীন জমিদারি আমলের স্মৃতি, সাহিত্যিকদের পদচিহ্ন এবং নদীর বয়ে চলা এক অনন্ত সময়ের সাক্ষ্য। কারও কাছে শহরটি এক নির্মল প্রশান্তি, কারও কাছে কাব্যময় বিষাদ। শিশুদের হাসি কিংবা ব্রহ্মপুত্রের নিরবধি প্রবাহ সবকিছুতেই যেন লুকিয়ে আছে গল্প, কবিতা।

ব্রহ্মপুত্র শুধু একটি নদী নয়, এটি যেন এই শহরের হৃদস্পন্দন। কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন,“ব্রহ্মপুত্রের ধারে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, এই নদী যেন ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি বয়ে নিয়ে চলেছে,একদিকে ক্ষয়, অন্যদিকে সৃষ্টি।” ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও বংশী, কংশ, ধলেশ্বরীসহ একাধিক নদ-নদী রয়েছে, যেগুলো অঞ্চলটির জীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
ময়মনসিংহকে বলা হয় ‘শিক্ষানগরী’। এখানে অবস্থিত দেশের প্রথম ও বৃহত্তম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৫টির বেশি বিভাগ ও ৬টি অনুষদ ছাড়াও রয়েছে গবেষণা কেন্দ্র, বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ‘বিজয় ৭১’ ভাস্কর্য। দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞান আহরণে ছুটে আসেন। তাছাড়াও প্রতিনিয়তই এখানে ক্যাম্পাস দর্শনার্থীরা আসে সুন্দর, মনোরম পরিবেশে শিক্ষামূলক সময় কাটানোর জন্য।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে অবস্থিত ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’। এটি ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সংগীত চর্চায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে বিশেষ অবদান।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘আনন্দমোহন মহাবিদ্যালয়’ ময়মনসিংহ শহরের গর্ব। ১৮৮০ সালে শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক আনন্দমোহন বসুর হাত ধরে এ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন একটি মহাবিদ্যালয় হিসেবেও বিবেচিত। এখানে বর্তমানে ২০টি বিষয়ে অনার্স ও ১৮টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে।
এছাড়াও ময়মনসিংহে রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও খ্যাতনামা একটি মেডিকেল কলেজ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ। পাশাপাশি ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ শহরের শিক্ষা-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
এই শহরের অলিগলির পাশাপাশি ইট পাথরেও লুকিয়ে আছে শতাব্দীর পুরনো গল্প। অঞ্চলটিতে বহু সময় আগেই শুরু হয়েছিল জমিদারি শাসন। যার চিহ্ন এখনো দৃশ্যমান। ময়মনসিংহ অঞ্চলে কয়েকটি রাজবাড়ীর দেখা মিলে। এই অঞ্চলটিতে রাজা বা জমিদারের শাসন শুরু হয় মূলত মোঘল আমল থেকে যা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ ১৯৫০ এর দিকে।
ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অঞ্চলে রয়েছে শশী লজ। মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী ১৯০৫ সালে এটি নির্মাণ করেন। তবে বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদার বাড়ির জিনিসপত্র এখানে রয়েছে। জাদুঘর দেখার জন্য ইতিহাস প্রেমীরা প্রতিনিয়তই এখানে আসেন। এই রাজবাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে পুকুরপাড়, ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকলেও যে জায়গার প্রতি বিরক্তি আসে না।
শশী লজ থেকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই দেখা মিলে অন্য আরেকটি ঐতিহাসিক নিদর্শনের, যা নির্মাণ করেছিলেন মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ইউরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যের মিশ্রণে। এটি আলেকজান্ডার ক্যাসেল নামে পরিচিত এবং এটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৮৭৯ সালে।

ময়মনসিংহ শহর থেকে ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির অবস্থান। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি ছিল সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র। বর্তমানে বেশিরভাগ জায়গা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্য পর্যটকদের কাছে এখনো এটি অনেক প্রিয় গন্তব্য। এর পাশেই রয়েছে জোড়া মন্দির যা স্থানীয়ভাবে আনন্দময়ী শিব ও কালী মন্দির নামে পরিচিত। তবে মুক্তাগাছা শুধু জমিদার বাড়ির জন্যই নয় বরং তার মণ্ডার জন্যও বিখ্যাত। বর্তমানে মুক্তাগাছার মণ্ডা জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে।
এসব ছাড়াও গৌরীপুর রাজবাড়ি, আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি, রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে যুগের পর যুগ ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এছাড়াও ময়মনসিংহে রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা, মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, দেশের একমাত্র মিঠা পানির কুমির গবেষণা ইন্সটিটিউট জেলার ভালুকা উপজেলায় অবস্থিত।
ময়মনসিংহ অনেকের কাছেই কেবল একটি শহর নয়, বরং স্মৃতিভরা একটি অনুভব। এটি যেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক সেতুবন্ধন প্রতিবার ছুঁয়ে গেলে যেন নতুন করে মনে পড়ে যায় নিজের শেকড়, পরিচয় ও ইতিহাস। শহরটি যেন যত্নে লেখা এক পুরনো ডায়েরি যা যতই পড়া হোক, প্রতিবারই মনে হয়, কিছু যেন থেকে গেছে জানার জন্য, খোঁজার জন্য।