অনিকের লাল মনা
অনিকের লাল মনা
আশরাফ আলী চারু
আহমেদ সাগর দীর্ঘদিন সেনাবাহিনীতে চাকুরি করে অবসরে এসেছেন। গাঁয়ের সবাই তাঁকে খুব ভালোবাসেন। তাঁকে ভালোবেসে সাগর সাহেব আবার কেউ কেউ সাগর ম্যালেটারি বলে সম্বোধন করেন। কিছু সামাজিক কাজ করার জন্য তিনি সবার কাছে খুবই জনপ্রিয়। মাঝে মাঝে তিনি আনকমন কিছু কাজ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবার সাগর সাহেব একটা বাছুর কিনে এনেছেন। গায়ে গতরে বাছুরটা হ্যংলাপাতলা হলেও গায়ের রঙটা লাল। তার উপর গলায় বাদামি চরকা কাটা। দেখতে বেশ চমৎকার। বাছুরটা কিনে আনার পর হতে অনিক পিছু ছাড়ছে না। রাত হয়ে গেছে তবু সে বাছুরের আশেপাশেই দাঁড়িয়ে থাকছে। অনিক হলো সাগর সাহেবের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। সাগর সাহেবের বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে অনিকদের বাড়ি। দীর্ঘক্ষণ অনিককে এখানে অবস্থান করতে দেখে কাকা বললেন- অনিক বাড়িতে যাস না, বাপ?
-কাকা, আরেকটু দেখি। বাছুরটা না খুব সুন্দর!
– এক কাজ করিস কাল থেকে তুই বাছুরটাকে দেখে রাখিস। দেখে শুনে রাখার দায়িত্ব তোকে দিয়ে দিলাম। যা এবার বাড়ি গিয়ে পড়তে বোস। নয়তো তোর মা বকবে।
– বকবে কেন? স্যার বলেছেন আমি অনেক পড়া পারি? আমার রোল নম্বর এক। স্যারেরা আমাকে খুব ভালোবাসেন।
সাগর সাহেবও জানেন ছেলেটি খুব মেধাবী।
জুমা বার। জুমার নামাজের খোতবার আগে সাগর সাহেব মিম্বরে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বললেন- সম্মানিত এলাকাবাসী, গত বুধবার হাঁট হতে আমি একটা বাছুর কিনে এনেছি। আপনারা যদি অনুমতি দেন বাছুরটা আমি এঁড়ে করে দিতে চাই। আপনারা বাছুরটাকে দেখে শুনে রাখবেন। আল্লাহ চাহেতো আগামী কোরবানি ঈদে বাছুরটা কোরবানি দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। উপস্থিত মুসুল্লিগণ কেউ না করলেন না। উপরন্তু সাগর ম্যালেটারির এই সামাজিক কাজে মৌন সম্মতি জ্ঞাপন করলেন।
সাগর কাকার সেদিনের কথামতো অনিক বাছুরটাকে চোখে চোখে রাখে। বাছুরটা কোথায় যায় এটা দেখে রাখা যেন তার কর্তব্য কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে মনে সে বাছুরটাকে নিজের করে ভাবতে শুরু করেছে। স্কুল খোলা থাকলে সকালে এবং বিকালে আর স্কুল বন্ধ থাকলে সে সারাদিনই বাছুরটার পেছনে পেছনে দৌঁড়ায়। গাঁয়ের মানুষেরা বাছুরটাকে আইড়ে বাছুর বলে ডাকলেও অনিক তার নাম রেখেছে মনা।
যেখানে মনে চায় সেখানে খেয়েদেয়ে মনা ঘুরে বেড়ায়। বিকেল হলে অনিক খেদিয়ে এনে সাগর কাকার গোয়াল ঘরে তুলে। এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ একদিন মনাকে খুঁজে পাচ্ছিলনা অনিক। এর ওর কাছে জিজ্ঞেস করে অবশেষে জানতে পারলো মনাকে সুতার বাড়ির কেউ একজন সকাল থেকে বেঁধে রেখেছে। অপরাধ হলো মনা ওদের ক্ষেতের ধান নষ্ট করেছে। অনিক দৌঁড়ে গেল সুতার বাড়ি। মনাকে খুঁজে পেল। কাছে গেল। সুতারের বউ বাছুরের কাছে অনিককে দেখে কয়েক গা দিতে বাদ রাখলো না। অনিক যতই কিছু বলতে চাইলো ততই গুঁতো খেলো সুতারের বউয়ের কাছে। এক পর্যায়ে অনিক বলতে পারলো- ও দাদী, আমাকে মারছো আরও মারো, কিন্তু মনাকে মারনি তো?
-চ্যাংরা ছেরা কয় কি? আমার ধানের ক্ষেতের বারোডা বাজাইছে আর আমি নাকি ওর মনারে মারছি কি না জানতে চায়! এই ছেরা তোর বাপের নাম কি? দাদী ডাকছস যে!
-ছৈমুদ্দিন। ও দাদী, ছৈমুদ্দিনের ছেলে আমি।
– তুই ছৈমদ্দির পোলা! এই ছেরা, আগে কবিনা! তোর বাপে শুনলে কি কবো। যা যা বাছুর নিয়ে যা। যা, দেখে রাখিস।
-দেখেইতো রাখি, তাও কেমন যেন পাগলামি করে মনাটা। আর ওটা আমাদের না। সাগর কাকা কোরবানির জন্য এঁড়ে করে দিয়েছেন। বলতে বলতে মনার গলার দড়ি খোলে দিয়ে খেদিয়ে নিয়ে যেতে থাকে অনিক।
পবিত্র ঈদুল আযহা সমাগত। মসজিদের সামনে কথা হচ্ছিলো, মনা বেশ মোটাতাজা হয়েছে। তবে দাঁত উঠেনি। অদাঁতের গরু কোরবানি না দেওয়াই ভাল। আবার কেউ একজন বলছিল-মোটাতাজা হলে দাঁত ওঠতে হয় না। জায়েজ হবে। এখন সাগর কাকা বললেই হয়। পাশেই দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো অনিক।
অনিক এসব শুনে দৌড়ে গেল সাগর কাকার বাড়ি। গিয়ে কাকাকে বাড়িতে পেলো। অনিক কাঁদতে কাঁদতে বললো – কাকা, গাঁয়ের সবাই বলছে মনাকে না-কি এবার ঈদেই কোরবানি দিবে?
– অনিক, বাপ আমার, কোরবানি হলো আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য পশু জবাই। মূলত মনের পশুত্ব জবাইয়ের প্রকাশ্যরুপ এটি। তোর মনাকে যে এই নিয়তেই কিনেছিলাম বাবা।
অনিক আল্লাহকে রাজি খুশি করার কথা শুনে কান্না থামিয়ে মনার দিকে নিস্পলক চেয়ে রইলো। মনে মনে বললো সেটাতো বুঝিই কাকা। আমি তো ভেবেছিলাম এবার ঈদে না হয়ে পরের বছরের কথা। কাকার কথায় অনিক শিওর হলো মনাকে এবারই কোরবানি দেওয়া হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা বিবেচনায় আর একটি কথাও বলার সাহস পেল না অনিক।
অনিককে আনমনা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাগর কাকা কিছু টাকা অনিকের হাতে গুঁজে দিতে চায়লেন। অনিক টাকা না নিয়ে বললো- কাকা, আল্লাহ মনাকে খুব ভালোবাসেন তাই না? তাই মনে হয় মনাকে আল্লাহ এই বছরই কবুল করেছেন। আমিও খুশি। আমার টাকা চাই না কাকা। আমি মনাকে যে এই অল্প সময় দেখেশুনে রাখতে পেরেছি এবং ভালোবাসতে পেরেছি এর সামান্য সওয়াব যেন মহান আল্লাহ আমাকে দেন।
এরই মধ্যে গলায় দড়ি না থাকা মনা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যেতে পথ ধরলো। মনা যাসনে, যাসনে বলে ডাকতে ডাকতে অনিকও মনার পেছনে পেছনে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যেতে থাকলো।