বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ড্রেজিং স্কিম‘‘রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং’’সফলভাবে সম্পন্ন
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাস্তবায়িত বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ড্রেজিং স্কিম ‘‘রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং’’ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বেলজিয়াম ভিত্তিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান Jan De Nul আলোচ্য ড্রেজিং কাজটি সম্পন্ন করে। আজ ২৬ মার্চ, ২০২৩ খ্রিঃ মহান স্বাধীনতা দিবসে Jan De Nul কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট চ্যানেলটি হস্তান্তর করা হয়।
এ উপলক্ষ্যে আজ সকাল সাড়ে ১১ টায় পায়রা বন্দরের সভাকক্ষে বন্দর কর্তৃক একটি প্রেস ব্রিফিং এর আয়োজন করা হয়। এতে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল, ওএসপি, এনইউপি, পিপিএম, পিএসসি, বিএন, স্কিম পরিচালক কমডোর রাজীব ত্রিপুরা, (ই), এনডিসি, পিএসসি, বিএন, বন্দরের সদস্যবৃন্দ এবং Jan De Nul এর প্রকল্প পরিচালক Jan Moens-সহ পায়রা বন্দর ও Jan De Nul এর অন্যান্য কর্মকর্তাগণ এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন। উক্ত প্রেস ব্রিফিং-এ আরো উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (পটুয়াখালী-৪) জনাব মুহিব্বুর রহমান মুহিব।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল, ব্রিফিং এর শুরুতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সকল শহীদ সদস্য-কে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এছাড়াও তিনি জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধে আত্নোৎসর্গকারী ৩০ লক্ষ শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং সকলের রূহের মাগফেরাত কামনা করেন।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ও মেইনটেনেন্স ড্রেজিং প্রকল্পটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এককভাবে সবচেয়ে বড় প্রকল্প, যা পায়রা বন্দর সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। এর মাধ্যমে পায়রা বন্দরের চ্যানেলের গভীরতা ১০.৫ মিটারে উন্নীত হয়ে পায়রা বন্দর বর্তমানে দেশের গভীরতম বন্দরে রূপান্তরিত হয়েছে। এর ফলে ২২৫ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩২ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট PANAMAX আকৃতির বড় জাহাজ ৪০,০০০ – ৫০,০০০ মে. টন/ ৩,০০০ – ৩,৫০০ TEUs পণ্য নিয়ে সরাসরি পায়রা বন্দরে ভিড়তে পারবে। বন্দরের এই সক্ষমতার মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রসার ঘটবে এবং দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
তিনি জানান, আগামী মে, ২০২৩ খ্রিঃ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল উদ্ভোধন করার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। টার্মিনালটি চালু হলে বন্দরের আমদানী-রপ্তানী কার্যক্রম বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, বন্দরের রাজস্ব আয় বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আবদান রাখবে। বন্দর চেয়ারম্যান আরো বলেন, চ্যানেলের নাব্যতা ১০.৫ মিটারে উন্নীত হওয়ার ফলে ট্রান্সশিপমেন্ট-এর মাধ্যমে খাদ্যশস্য, সার, আমদানিকৃত গাড়ী ও অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ নগরী ও পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে পণ্য পরিবহনে খরচ ও সময় উভয়ই সাশ্রয় হবে।
তিনি আরো বলেন, ড্রেজিং এর ফলে বড় বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরে আনয়নপূর্বক আমদানী-রপ্তানী বৃদ্ধিকরতঃ দক্ষিণাঞ্চলকে অর্থনীতির মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে এবং দেশের জিডিপি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, পায়রা বন্দরের ট্যারিফ রেইট চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের চেয়ে গড়ে ২০%-৩০% কম, যা বন্দর ব্যবহারকারীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করবে।
স্কিম পরিচালক কমডোর রাজীব ত্রিপুরা বলেন, এ ধরনের দীর্ঘ ৭৫ কি.মি. চ্যানেল এর ক্যাপিটাল ড্রেজিং বাস্তবায়নের পূর্বে দীর্ঘ কয়েক বছর স্টাডি ও সমীক্ষা করা হয়েছে। উক্ত স্টাডি হতে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নেদারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান Royal Huskuning এবং CDR কর্তৃক বিশ্লেষণ করা হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান HR Wallingford এর সিম্যুলেটরে Real Time Simulation এবং Underside Keel Clearance পরীক্ষা করে চূড়ান্তভাবে আন্তর্জাতিক মানের একটি চ্যানেল ডিজাইন করে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়। এই চ্যানেল ব্যবহার করে এখন অনায়াসেই বন্দরে PANAMAX আকৃতির বৃহৎ জাহাজ বন্দরে চলাচল করতে সক্ষম হবে। এর ফলে বন্দর তথা জাতীয় আমদানী-রপ্তানীর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
Project Director JDN, Jan Moens বলেন, বাংলাদেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রার ক্যাপিটাল ও মেইনটেনেন্স ড্রেজিং এর কাজে সরাসরিভাবে যুক্ত হতে পারা Jan De Nul এর জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। JDN এই প্রকল্পে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের চ্যানেল সাফল্যজনকভাবে খনন শেষ করে আজ খুবই আনন্দিত। JDN আশা করে, এই সাফল্যের মাধ্যমে দু’দেশের সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব মুহিব্বুর রহমান মুহিব বলেন, ক্যাপিটাল ড্রেজিং শেষ হবার ফলে পায়রা বন্দর বিশ্বের একটি শ্রেষ্ঠ বন্দরে পরিনত হয়েছে। এই বন্দরের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্ম সংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মানুষের জীবন-মানের উন্নয়ন ঘটবে।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল বলেন, পায়রা বন্দর বাংলাদেশ স্বাধীনের পর নির্মিত দেশের প্রথম স্মার্ট বন্দর। এ বন্দর এখন আর সম্ভাবনা নয়, বাস্তবতা। ২০২৩ সালকে তিনি পায়রা বন্দরের বছর বলে তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
পাবক চেয়ারম্যান আরো জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় একটি আধুনিক মাষ্টার প্ল্যানের আওতায় এই বন্দরটি ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬,৫০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
আগামীতে বন্দরে প্রথম টার্মিনালের সাথে যুক্ত হচ্ছে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল (১২০০ মি.), কন্টেইনার টার্মিনাল-১ (১৪০০মি.), কন্টেইনার টার্মিনাল-২ (১৪০০মি.), লিকুইড বাল্ক টার্মিনাল, কোল টার্মিনাল, এলএনজি টার্মিনাল ইত্যাদি।
তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে এ বন্দরকে ঘিরে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, তারা বিভিন্নভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করছেন ও উপযুক্ত বিনিয়োগের সুযোগ খুজছেন।
তিনি বলেন, পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠছে পায়রা শিল্প নগরী, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রি, ডক ইয়ার্ড, বিমান বন্দর ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং সৃষ্টি হচ্ছে প্রচুর কর্মসংস্থানের। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শীঘ্রই পায়রা বন্দর হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র তথা ‘Economic Hub’।
বন্দর চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তথা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে পায়রা বন্দর বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহন সচিব মহোদয়সহ বন্দরের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন।