ঈশ্বরগঞ্জে ভূমিহীন রেখেই, ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত উপজেলা ঘোষণা
বঙ্গবন্ধুকন্যা অনেক মানুষকে ঘর দিয়েছেন। আমিও একটি ঘর চাই, ঘরটি পেলে আমার দুঃখ ঘুচতো, ছেলে-মেয়েগুলোকে নিয়ে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হতো, মানুষের ঘরে ঘরে আশ্রয় খুঁজতে হতো না’।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীতে মুজিববর্ষের একটি ঘর চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এভাবেই আকুতি জানান উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের বড়জোড়া গ্রামের ছোলেমা বেগম। দুর্ঘটনায় মারা গেছেন স্বামী। মানুষের বাসা-বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কাজ করেন। সাথে পুরাতন জামা-কাপড়ও চেয়ে আনেন। সেই কাপড়গুলো ভালভাবে ধুয়ে পরিস্কার করার পর পুটলি বেঁধে ছোটেন গ্রামগঞ্জে। ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কারও বাড়িতে দুই বছর,কারও বাড়িতে তিন বছর করে থাকেন তিনি। এভাবেই চলছে তার যাযাবর জীবনযাপন। ছোলেমার রয়েছে স্বামীর রেখে যাওয়া এক মেয়ে দুই ছেলে সন্তান। বর্তমানে তার আশ্রয় হয়েছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের বড়জোড়া গ্রামের মরহুম হরমুজ আলীর বাড়িতে। এর আগে ২০২১ সালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেও তিনি পাননি মাথা গোঁজার ঠাঁই। একই ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের সাবেক মহিলা ইউপি সদস্য মঞ্জিলা খাতুন বলেন, ছোলেমা আমার প্রতিবেশী ভাগনী হয়। সে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছে। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে থাকে।তার কোন জমি নাই। সে আবেদন করার পরেও পাইনি ঘর। ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাইদুল ইসলাম বাবুল বলেন, মহিলা(ছোলেমা) যদি আবার ঘরের জন্য আবেদন করে আমি নিজে মহিলাকে সাথে নিয়ে ইউএনওর কাছে যাব।
শুধু ছোলেমা বেগমেই নন, ঘর পাননি তার মতো আরও অনেক ভূমিহীন মানুষ। আর এসব ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষকে রেখেই গত ৯ আগস্ট বুধবার ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলাকে ঘোষণা করা হয়েছে ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত উপজেলা হিসেবে। সচেতন মহলের লোকজন বলছেন, ঘোষণা দেওয়ার পরে ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকার দায় এড়াতে পারেন না ইউএনও ও জনপ্রতিনিধিরা।
আবেদন করেও ঘর পাননি আরেক ভূমিহীন কাজল চন্দ্র সরকার (৩৮)। পেশায় তিনি একজন ইজিবাইক চালক। তিনি স্বর্গীয় দুলাল চন্দ্র সরকারের ছেলে। জমি না থাকলেও তিনি পাননি কোন ঘর। তার সামান্য আয়ে বাসা ভাড়া দিয়ে দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ পৌর এলাকার কালিবাড়ি রোডে থাকেন তিনি। এই উপার্জন দিয়ে সংসার চালাতে না পারায় তার স্ত্রী পদ্ম পাল পৌর এলাকার বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজ করেন। স্ত্রী পদ্ম পাল বলেন, স্বামীর আয়ে চলেনা সংসার। তাই আমি মানুষের বাসায় কাজ করি। যদি একটা ঘর পাইতাম তাহলে ভাড়া দেওন লাগতোনা। সেই টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েদের ভালভাবে পড়াশোনা করাতে পারতাম। প্রতিবেশী রাজব দাস বলেন, সে একজন প্রকৃত ভূমিহীন। সে ঘর পাওয়ার উপযুক্ত।
কথা হয় আরেক ভূমিহীন মোছা. ইনসান বানুর সাথে।বয়স ৮০ ছুঁইছুঁই। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন, হাঁটাচলাও তেমন করতে পারেন না। স্বামী নূরুল হক প্রয়াত হয়েছেন অনেক আগেই। একমাত্র মেয়ে সালেমা খাতুনকে নিয়ে ঠাঁই হয়েছে উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের এনায়েতনগর গ্রামের এনায়েত উল্লার বাড়িতে। ইনসান বানু বলেন, পরের জায়গা ও পরের ঘরে থাকি। এক বেলা খাইলে দুইবেলা উপোষ থাকি। হুনছি সরকার জায়গাসহ ঘর দিতাছে। একটা ঘর পাইলে শেষ বয়সে অন্তত নিজের ঘরে শান্তিতে মরতে পারতাম। কেমনে কি করে জানিনা। তারা আরও বলেন, জনপ্রতিনিধিরা খোঁজখবর নেয়নি বলে এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
তাদের আশ্রয়দাতা এনায়েত উল্লাহ বলেন, তারা আসলেই ঘর পাওয়ার যোগ্য লোক।আমাদের বাড়িতে থাকে। নিজের কোন জমি নাই। তাদের দেখাশোনা করার মতোও কেউ নাই।
আরেক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভূমিহীন বিধবা মনোয়ারা (৫৬)। স্বামীর ভিটেমাটি না থাকায় জায়গা হয়েছে ছোট ভাই আজিজুলের বাড়িতে। ছোট ভাই আজিজুল উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের নারায়ণপুর গ্রামে। দুটি মেয়ে নিয়ে তিনি পড়েছেন বিপাকে। মনোয়ারা বলেন, আমার স্বামী নাই, তার কোন জমিও নাই। ভাইয়ের বাড়িত নানান কথা সহ্য করে কষ্টে থাকি। একটা ঘরের লাগি মেম্বার কাছে গেছিলাম, তিনিও ফিরিয়ে দিয়েছেন। জায়গাসহ একটা ঘর পেলে মাইয়াগুলো নিয়া থাকতে পারতাম।
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজা জেসমিন বলেন, যারা আবেদন করেছেন তাদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে ঘর প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে পরামর্শ করে ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, প্রতিটি উপজেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে সেই কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত উপজেলা ঘোষণা করেছি। কমিটিতে জনপ্রতিনিধিরা আছেন। যদি জনপ্রতিনিধিরা বলে যে তার ইউনিয়নে আর কোন ভূমিহীন নাই তাহলে এটা তো তাদের দিকে যায়। তবুও যদি কোন ভূমিহীন বাদ পরে থাকে তাহলে ৫ম ধাপে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।