শুধু ব্যবসা নয়, আস্থার বীজ বুনছে গ্রো আপ
বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অথচ এই খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে এখনও রয়ে গেছে অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা। এমন বাস্তবতায় কৃষিকে কেন্দ্র করে নতুন এক মডেল নিয়ে আলোচনায় এসেছে গ্রো আপ এগ্রোটেক লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা প্রচলিত ঋণভিত্তিক অর্থায়নের বাইরে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করছে। অর্থাৎ কৃষককে শুধু ঋণ দিয়ে দায়বদ্ধ করা নয়, বরং উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় সহযোগী হিসেবে পাশে থাকার চেষ্টা করছে। এই ধারণাই গ্রো আপ-কে বাংলাদেশের কৃষি খাতে একটি ভিন্নধর্মী উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।
গ্রো আপ-এর যাত্রার পেছনে রয়েছে উন্নয়ন সংস্থা রোসা-এর দীর্ঘ মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে কৃষি অর্থায়নের একটি বিকল্প মডেল তৈরির ভাবনা আসে। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় গ্রো আপ। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, তারা কৃষকদের জন্য শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে|
বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এখনও চাষাবাদের মৌসুমে মূলধন সংকটে ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের স্থানীয় মহাজন বা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। এতে উৎপাদনের আগেই আর্থিক চাপ তৈরি হয়। গ্রো আপ মনে করে, কৃষককে ঋণগ্রহীতা নয় বরং অংশীদার হিসেবে দেখলে সেই চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাদের মডেলে কৃষকের সফলতাই প্রতিষ্ঠানের সফলতা।
প্রযুক্তির ব্যবহার গ্রো আপ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদান এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার কথা বলছে। কৃষিতে প্রযুক্তির এই সংযোজনকে অনেকেই সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্মার্ট কৃষি ইতোমধ্যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণও বাংলাদেশের কৃষকদের দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জ। মাঠে যে দামে কৃষক পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সময় সেই মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। গ্রো আপ-এর পরিকল্পনা হলো কৃষিপণ্যকে আরও সংগঠিতভাবে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। তাদের মতে, এতে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে কৃষিভিত্তিক বিনিয়োগের ধারণাও নতুন করে আগ্রহ তৈরি করছে। ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র বা প্রচলিত বিনিয়োগ মাধ্যমের বাইরে এখন অনেকেই উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছেন। গ্রো আপ সেই সুযোগকে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সাধারণ মানুষও এখন কৃষি খাতের অংশীদার হতে পারছেন।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও রয়েছে। বিনিয়োগের নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং ঘোষিত মুনাফার হার নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো নতুন আর্থিক মডেলের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ধারাবাহিক ফলাফলের ওপর। ফলে গ্রো আপ-এর ক্ষেত্রেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব বিষয়ের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের কৃষি এখন পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং নতুন অর্থায়ন মডেল কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই পরিবর্তনের ধারায় গ্রো আপ একটি আলোচিত নাম। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে কতটা সফল হবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে কৃষিকে ঘিরে নতুন চিন্তা ও নতুন বিনিয়োগ সংস্কৃতির আলোচনায় গ্রো আপ ইতোমধ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।