রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
QR Code
স্ক্যান করে অনলাইনে পড়ুন
jagobulletin.com /jagobulletin22 ঢাকা, বাংলাদেশ

হাদী ও এক অনিশ্চিত সময়

জাগো বুলেটিন ID: EP-39149

আমি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নই। বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতি দেখেই রাজনীতির প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা জন্মেছে এ কথাটা লুকানোর কিছু নেই। ছাত্রজীবনে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জীবন জীবিকার বাস্তবতা ও ইতিহাসের ধারার সঙ্গে নিজের অবস্থান মেলাতে না পেরে ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে এসেছি। প্রায় ২৩ বছর হয়ে গেল। এখন নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই ভাবতে ভালো লাগে দিন আনে দিন খায়, পেটের চিন্তাতেই ব্যস্ত থাকে।

ক্লাস নাইনে পড়ার সময় পারিবারিক মনস্তত্ত্ব, সামাজিক প্রভাব ও একধরনের অন্ধবিশ্বাস থেকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। পরে বিভিন্ন সূত্রে দেশের ইতিহাস জানার চেষ্টা করতে গিয়ে উপলব্ধি করি ১৯৪৭ পরবর্তী সময় থেকে নানা রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের স্বার্থে ইতিহাসকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে। এর ফলে সমাজে যে ভুল ন্যারেটিভ গড়ে উঠেছে, তা থেকে মানুষকে বের করে আনা অত্যন্ত কঠিন অনেক ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। এই উপলব্ধিই আমাকে রাজনীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য করে।

দীর্ঘদিন আমার বিশ্বাস ছিল এই পুরনো ন্যারেটিভ ভাঙার চেষ্টা কেউ করবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু কণ্ঠস্বরকে তা প্রশ্ন করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন হাদী। তাঁর ওপর গুলিবর্ষণের খবর শোনার পর নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। মনে হয় এই দেশ কি স্পষ্টভাষীদের জন্য নয়? যারা প্রশ্ন তোলে, তারা কি এখানে নিরাপদ?

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে হাদীর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলেই জানা যাচ্ছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো পরিবার ও চিকিৎসকদের বিষয় এ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে পুরো ঘটনাটি সমাজে গভীর উদ্বেগ ও ভয় তৈরি করেছে, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এই ঘটনার পর অনেকের মধ্যেই ‘টার্গেটেড অ্যাটাক’ বা পরিকল্পিত সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একটি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে সরিয়ে দিলে আদতে কার লাভ হয় এই প্রশ্নটিও ঘুরে ফিরে আসছে। আমরা প্রায়ই বলি, একজন গেলে শতজন জাগবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভয় ও অনিশ্চয়তা মানুষকে চুপ করিয়ে দেয়। সহিংসতা ও আক্রমণের আশঙ্কা নতুন কণ্ঠস্বর গড়ে ওঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দেশ গভীরভাবে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। অতীতে যেভাবে মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছিল, এখন সেই ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ সীমাবদ্ধ থাকছে, রাজপথ তুলনামূলক নীরব। এই প্রেক্ষাপটে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদী বা ‘বাংলাদেশপন্থী’ কণ্ঠগুলো ক্রমে আরও একা হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

অনেকে মনে করছেন, একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া যদি সীমিত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা বাড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পাশাপাশি ধর্মীয় উত্তেজনা বা সামাজিক বিভেদের অপব্যবহার করে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কাও আলোচনায় আসছে। এসব আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিক এমনটা কেউই চায় না।

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে একজনের ক্ষতিতে আরেকজনের স্বস্তি খোঁজার প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু এতে যে সবার জন্যই ঝুঁকি বাড়ে সে উপলব্ধি অনেক সময় দেরিতে আসে। বিভক্তি যত বাড়বে, ততই অনিশ্চয়তা গভীর হবে।

এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে অভিযুক্ত করা নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা দেওয়া ভয়, বিভেদ ও নীরবতা যদি আমাদের অভ্যাস হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিটা সামষ্টিক। প্রশ্ন তোলা, ভিন্নমত প্রকাশ এবং মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই মৌলিক বিষয়গুলো রক্ষা করা না গেলে সামনে যে সময়টা অপেক্ষা করছে, তা যে সহজ হবে না এ কথা বলাই যায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, উত্তরা ইউনিভার্সিটি