কংক্রিটের নিচে ধুঁকছে মাটি
বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা, শীতে ধুলার রাজ্য আর গ্রীষ্মে তীব্র দাবদাহ শহরের এই পরিচিত দুর্ভোগের জন্য আমরা নানা ব্যাখ্যা খুঁজি। ড্রেনেজ ব্যবস্থা কিংবা নগর পরিকল্পনার সমালোচনা করি। কিন্তু একটি ধ্রুব সত্য আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই- শহরের তলদেশের মাটি ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কংক্রিটের ভারী স্তরের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে উর্বর ‘টপসয়েল’। বৃষ্টির পানি যে মাটি শুষে নেবে, তার ছিদ্রগুলো আজ বন্ধ। ফলে শহর হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য। বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সুস্থ শহরের জন্য স্বাস্থ্যকর মাটি’-তাই কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি শহরের বাতাস, তাপমাত্রা, পানি আর মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা।
শহর বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশচুম্বী ভবন, জঞ্জালপূর্ণ রাস্তা আর কৃত্রিম আলোর ঝলকানি। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকায় কংক্রিটের আগ্রাসন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নতুন রাস্তা, ফ্লাইওভার আর আবাসন প্রকল্পের চাপে মাটির শ্বাস নেওয়ার উপায় নেই। অথচ মাটির ওপরের এই কংক্রিটের আস্তর বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে পৌঁছাতে দেয় না। নির্মাণের আগে নিয়ম মেনে টপসয়েল সংরক্ষণ করা হয় না, বরং তা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে উদ্যান বা খোলা জায়গার মাটিও তার প্রাণশক্তি হারায়। যার চূড়ান্ত ফল: সামান্য বৃষ্টিতেই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে অসহনীয় ধুলোবালি।
সমস্যা কেবল মাটির ওপর আবরণে নয়, দূষণও মাটির জীবনীশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। নির্মাণবর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন এবং যানবাহনের ধোঁয়া মাটির রাসায়নিক গঠন বদলে দিচ্ছে। শহরের মাটিতে সিসা, ক্রোমিয়াম বা আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এই বিষাক্ত মাটিতে গাছের শেকড় ছড়াতে পারে না, পানি ধারণক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফুটপাতের ধারে লাগানো গাছগুলো যে অকালে মরে যায় বা বাড়ে না, তার মূল কারণ এই রুগ্ণ মাটি।
আধুনিক নগর পরিকল্পনায় বিশ্বজুড়ে এখন ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণাটি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মূল দর্শন হলো: শহরের মাটিকে এমনভাবে সংরক্ষণ করা, যেন তা স্পঞ্জের মতো বৃষ্টির পানি শুষে নিতে পারে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ করতে পারে। উন্নত বিশ্বের শহরগুলো এখন কংক্রিটের কঠিন আবরণের পরিবর্তে ‘পারমিয়েবল পেভমেন্ট’ বা ছিদ্রযুক্ত রাস্তার ব্যবহার বাড়াচ্ছে; রাস্তার পাশে তৈরি করা হচ্ছে ‘রেইন গার্ডেন’। অথচ আমাদের নগর পরিকল্পনায় মাটির এই শোষণক্ষমতাকে কাজে লাগানোর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। আমরা হাজার কোটি টাকা খরচ করে ড্রেনেজ সিস্টেম বানাই, কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ করে দিই। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, রাস্তার আইল, পার্কিং জোন বা ওয়াকওয়েতে কংক্রিটের বদলে ছিদ্রযুক্ত ব্লক বা ঘাস ব্যবহার করা কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিনিয়োগ। মাটিভান্ধব এই প্রযুক্তিগুলো গ্রহণ না করলে টেকসই শহর গড়া কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।
মাটির এই অসুস্থতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে জনস্বাস্থ্যে। আমরা যে গাছের ছায়ায় স্বস্তি খুঁজি, সেই গাছ মাটির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকে। মাটি যদি শক্ত, দূষিত বা মৃতপ্রায় হয়, তবে গাছও টিকবে না। ফলে ‘হিট আইল্যান্ড’ এফেক্টে শহর হয়ে উঠছে অগ্নিকুণ্ড। পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় শহর ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
অথচ স্বাস্থ্যকর শহর গড়তে মাটির প্রাণ ফেরানো অসম্ভব কিছু নয়। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ। শহরের অবশিষ্ট খোলা জায়গাগুলো সংরক্ষণ করা, পার্ক ও উদ্যানের মাটি রক্ষা, এবং বৃক্ষরোপণের সময় কংক্রিটের বেষ্টনী না দিয়ে গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত উন্মুক্ত মাটি রাখা জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ছাদবাগানে জৈব সারের ব্যবহার এবং বাসাবাড়ির পচনশীল বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করে মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার চর্চা শুরু করা যেতে পারে। নির্মাণবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর তদারকিও সময়ের দাবি।
মাটি অসুস্থ হলে শহর অসুস্থ হবে, আর সেই রুগ্ণ শহরে মানুষের সুস্থ থাকা অসম্ভব। কংক্রিটের জঙ্গল ভেদ করে মাটিকে শ্বাস নিতে দিতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে আছে সেই নীরব, অদৃশ্য মাটির স্বাস্থ্যের ওপর। ‘প্রাণের শহর’ গড়তে হলে আগে মাটির প্রাণ বাঁচাতে হবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।