অসদাচরণ ও কর্মস্থল থেকে পলায়নের মতো গুরুতর অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়ে আবারও স্বপদে বহাল হয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উপকমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। গত ৫ মার্চ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে চাকরিজীবনের শুরু থেকেই একের পর এক বিতর্ক, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তার পুনর্বহালের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা আগে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁরা এখন প্রতিশোধের আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী উপকমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত শুনানিতে তাঁর মৌখিক বক্তব্য ও লিখিত জবাব সন্তোষজনক বিবেচিত হওয়ায় অভিযোগ প্রত্যাহার করে তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে ভবিষ্যতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বারবার একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেন গুরুতর সব অভিযোগ উঠছে এবং কোন ক্ষমতার জোরে তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, স্বপদে ফিরে এসে তিনি আবারও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। আমরা এখন চরম আতঙ্কে আছি। কোন খুঁটির জোরে তিনি আবারও পুরোনো পদে ফিরলেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়। প্রতিশোধ নিতে তিনি আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারেন। আমরা চাই সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার করা হোক।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের কর্মজীবনের বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে।
-
পণ্য খালাসে অনিয়ম ও চোরাচালানের অভিযোগ: চলতি বছরের (২০২৬) সেপ্টেম্বর মাসে কাস্টমস ও ভ্যাটের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের বিরুদ্ধেও পণ্য খালাসে অনিয়ম এবং চোরাচালানে সহায়তার সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
-
ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি ও মামলা: ২০২৪ সালের জুন মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত থাকাকালীন রাশেদুল হক নামের এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহার অনুযায়ী, চাঁদা না দিলে তিনি ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দিয়েছিলেন।
-
নিলামে কেনা মালামাল জব্দ নিয়ে বিতর্ক: ২০২৪ সালের ২৫ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় তাঁর নেতৃত্বে কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের একটি দল একটি সুপারশপে অভিযান চালায়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বৈধভাবে সরকারি নিলামের মাধ্যমে কোটি টাকার পণ্য কিনেছেন বলে দাবি করলেও আবু হানিফের নির্দেশে সব মালামাল জব্দ করে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনা সে সময় স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
-
চট্টগ্রাম বন্দরে বিক্ষোভ ও শাস্তিমূলক বদলি: ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। সে সময় ফাইল যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে কর্মচারীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করেন এবং নামফলক ভেঙে ফেলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে ওই বছরের ২৬ জানুয়ারি এনবিআর তাঁকে দ্রুত বদলি করতে বাধ্য হয়। তৎকালীন বদলির আদেশে বলা হয়েছিল, সার্বিক কাজকর্ম সন্তোষজনক না হওয়ায় সুশাসন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় তাঁকে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে পদায়ন করা হলো। একই সঙ্গে তাঁর দাপ্তরিক আচার আচরণ, নৈতিকতা এবং সেবাধর্মী মানসিকতা গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পদক্ষেপ নিতে একাডেমির মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এতসব বিতর্ক ও অভিযোগের পরও কেবল সতর্ক করে তাঁকে বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখায় সাধারণ ব্যবসায়ী ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সৎ ও জবাবদিহির আওতায় থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
