বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারি চাকরিজীবীদের রাজপথে নামার ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। অথচ নবম পে-স্কেল গেজেট প্রকাশের দাবিতে সাম্প্রতিক আন্দোলনে সরকারি চাকরিজীবীরা জীবননাশের আশঙ্কার মুখে পড়েছেন— যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। ন্যায্য দাবির বিপরীতে এ জাতীয় ঘটনা শুধু একটি শ্রেণির নয়; এটি পুরো জাতির জন্যই বিস্ময়কর ও মর্মান্তিক।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে এমন দৃশ্য দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগ, ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা ও গণতান্ত্রিক প্রত্যাশাকে গভীরভাবে আহত করেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে কর্মরত নাগরিকদের এমন পরিস্থিতিতে পড়া নিঃসন্দেহে একটি বড় আস্থা সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
তবুও এত হতাশা ও ক্ষোভের মাঝেও পে-স্কেল বাস্তবায়নের আশা পুরোপুরি নিভে যায়নি সরকারি চাকরিজীবীদের। ধারাবাহিক আন্দোলন, জনমত ও আলোচনার প্রতিফলন খুব শিগগিরই দৃশ্যমান হওয়া উচিত। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই এ বিষয়ে সরকারি চাকরিজীবীগণ কোনো না কোনো স্পষ্ট বার্তা পাক— এমনটা প্রত্যাশা করা যেতে পারে। শেষটা ভালো হলে দীর্ঘদিন জমে থাকা সরকারি চাকরিজীবীগণের মনের কষ্ট অনেকাংশেই লাঘব হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো— এই অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রিতা সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বর্তমানে একমাত্র ক্যাডার সার্ভিস ছাড়া সাধারণ সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের আগ্রহ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। সময়োপযোগী বেতন কাঠামোর অভাব, সিদ্ধান্তহীনতা এবং ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনে নামলেই হয়রানির শঙ্কা তরুণ-সমাজকে সরকারি চাকরি থেকে বিমুখ করছে। এর ফলে রাষ্ট্র নিজেই দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।
এখানেই আসে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রশ্ন— যা আজ আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের অনিবার্য দাবি। বর্তমান বাস্তবতায় দ্রব্যমূল্য, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিদ্যমান পে-স্কেল তা সামাল দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। মধ্যম ও নিম্ন গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারীর জন্য সম্মানজনক জীবনযাপন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে, যা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন জরুরি আরেকটি মৌলিক কারণে— কর্মপ্রেরণা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে। দীর্ঘদিন একই বেতন কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকলে কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়, দায়িত্ববোধ দুর্বল হয় এবং কাজের গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একটি আধুনিক, গতিশীল ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে প্রেরণাদায়ী ও বাস্তবসম্মত পে-স্কেল অপরিহার্য।
এছাড়া বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক চাকরির সঙ্গে সরকারি চাকরির আর্থিক বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। যোগ্য ও মেধাবীরা তাই কেবল ক্যাডার সার্ভিস অথবা বিদেশমুখী হওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে এই ‘মেধাপ্রস্থান’ আরও তীব্র হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ন্যায্য পে-স্কেল রাষ্ট্র ও কর্মচারীর মধ্যকার আস্থার ভিত্তি পুনর্গঠনের একটি অপরিহার্য শর্ত। কর্মচারীরা যদি মনে করেন রাষ্ট্র তাদের শ্রম, সময় ও ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করছে, তাহলে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন না। বরং রাষ্ট্রের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তারা আরও দায়িত্বশীল অংশীদার হয়ে উঠবেন।
সুতরাং, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন কোনো একক গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ এবং জাতির আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন। সময়োপযোগী, ন্যায্য ও মানবিক সিদ্ধান্তই পারে এই সংকট থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে এগিয়ে নিতে। সরকারি চাকরিজীবীগণ এখন সেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে।
মোহাম্মদ অংকন, লেখক
