ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ সদস্যদের শপথ এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই যে দৃশ্যটি প্রায় অবধারিতভাবে দেখা যাচ্ছে, তা হলো ফুলেল শুভেচ্ছার ঢল। সংসদ সদস্য পাড়া, মন্ত্রী পাড়া, দলীয় কার্যালয় কিংবা ব্যক্তিগত বাসভবন—সব জায়গায় যেন এক প্রতিযোগিতামূলক উপস্থিতি। কর্মী, সমর্থক, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, আত্মীয়স্বজন—কেউ বাদ থাকেন না। ফুলের তোড়া যেন কেবল অভিনন্দন নয়; বরং একটি অদৃশ্য আবেদনপত্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে একে “symbolic politics” বা প্রতীকী রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখা যায়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক আচরণ আছে, যা প্রকাশ্যে সৌজন্য, কিন্তু অন্তর্গতভাবে ক্ষমতার বিনিময়-নীতির ইঙ্গিতবাহী। ফুলেল শুভেচ্ছা সেই প্রতীকী ভাষার এক দৃশ্যমান রূপ। এখানে অভিনন্দন ও অগ্রিম বিনিয়োগের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম দ্বৈততা কাজ করে। প্রকাশ্যে এটি সৌজন্য; অন্তর্গতভাবে এটি সম্ভাব্য সুবিধার পূর্বপ্রস্তুতি।
এই সংস্কৃতি নতুন নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের চর্চা। সামরিক শাসন-উত্তর গণতান্ত্রিক শাসনকাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন নির্বাচনী পালাবদলের পর একই দৃশ্য বারবার ফিরে এসেছে। প্রশ্ন হলো—এই ফুলেল শুভেচ্ছা কি নিছক সামাজিক সৌজন্য, নাকি এটি ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে সুবিধা আদায়ের এক সুসংগঠিত মনস্তত্ত্ব?
গত তিন দশকের নির্বাচনী পালাবদলের পর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চিত্রগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়—শপথগ্রহণের পরপরই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বাসভবনে ফুলেল শুভেচ্ছার দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই উপস্থিত থাকেন ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এই ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত করে—এটি কেবল সামাজিক রীতি নয়, বরং একটি পুনরাবৃত্ত রাজনৈতিক আচরণ-প্যাটার্ন।
তোষামোদির মনস্তত্ত্ব ও পেট্রন-ক্লায়েন্ট রাজনীতি:
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে “পেট্রন-ক্লায়েন্ট” সম্পর্ক একটি বহুল আলোচিত ধারণা। রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ James C. Scott তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ঘিরে এমন এক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়, যেখানে আনুগত্যের বিনিময়ে সুবিধা প্রদান করা হয়। এই বিনিময় কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার সঙ্গেও জড়িত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। স্থানীয় সরকার ও মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার বণ্টন কিংবা প্রশাসনিক বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নৈকট্য একটি অনানুষ্ঠানিক প্রভাবক হিসেবে কাজ করে—যদিও তা আনুষ্ঠানিক নীতিমালায় স্বীকৃত নয়। এই বাস্তবতা পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ককে কাঠামোগত ভিত্তি দেয়।
স্থানীয় পর্যায়ে এমপি বা মন্ত্রী কেবল নীতিনির্ধারক নন; তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, নিয়োগ, বদলি, ঠিকাদারি কিংবা প্রশাসনিক সুপারিশের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে ফুলেল শুভেচ্ছা হয়ে ওঠে আনুগত্যের দৃশ্যমান ঘোষণা। এখানে প্রত্যাশা থাকে—
- টেন্ডার প্রাপ্তি
- নিয়োগ বা পদোন্নতি
- মামলা প্রত্যাহার বা প্রশাসনিক সহায়তা
- অন্তত ব্যক্তিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি
ফুলের তোড়া তাই কেবল ফুল নয়; এটি ভবিষ্যৎ সুবিধার অগ্রিম বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের বাজারে প্রতিযোগিতা থাকে, নীরব হিসাব থাকে, এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রকাশ্য প্রদর্শন থাকে।
ওয়েবারীয় আমলাতন্ত্র বনাম ব্যক্তিনির্ভর প্রশাসন:
ভয়াবহ দিকটি হলো, এই তোষামোদির সংস্কৃতিতে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। সংবিধান ও প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মকর্তা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান বদলের প্রবণতা স্পষ্ট হয়।
প্রশাসনবিষয়ক গবেষণায় Max Weber যে “র্যাশনাল-লিগ্যাল ব্যুরোক্রেসি”র কথা বলেছেন, সেখানে আমলারা নিয়ম ও নীতির প্রতি অনুগত থাকবেন, ব্যক্তির প্রতি নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভর আনুগত্যই মুখ্য হয়ে উঠে। পদায়ন, ওএসডি সংস্কৃতি, পদোন্নতির অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া—এসব প্রশাসনিক বাস্তবতা একটি অঘোষিত বার্তা দেয়: রাজনৈতিক নৈকট্যই নিরাপত্তা। অতীতের বিভিন্ন সময়কালে প্রশাসনিক রদবদলের পরপরই ব্যাপক বদলি ও পদায়নের নজির গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে এবং প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি জোরদার করে। ফলে যোগ্য ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কোনঠাসা হয়ে পড়েন, আর সুবিধাবাদীরা হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী। এতে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা দুর্বল হয়। কারণ যে কর্মকর্তা রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সুযোগ পান, তাঁর পক্ষে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার জায়গায় স্থান নেয় ব্যক্তিস্বার্থ।
অন্ধকূপ, প্রতিধ্বনি ও ক্ষমতার বিভ্রম:
রাজনীতির পটপরিবর্তন নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়—যাঁরা গতকাল পর্যন্ত এক দলের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য দেখিয়েছেন, আজ তাঁরা অন্য শিবিরে সমান তৎপর। ফুলের তোড়া বদলায়, ব্যানারের ছবি বদলায়, কিন্তু সংস্কৃতি বদলায় না। উল্লেখ্য, এই প্রবণতা কোনো একক দল বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্য, যা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রূপ বদলায় কিন্তু প্রকৃতিতে প্রায় একই থাকে।
এই বাস্তবতাকে “অন্ধকূপ রাজনীতি” বলা যায়। এটি এমন এক প্রতিধ্বনির ঘর, যেখানে ক্ষমতাসীনরা কেবল প্রশংসা, শুভেচ্ছা ও সমর্থনের প্রদর্শন দেখেন। সমালোচনা ফিল্টার হয়ে যায়, সতর্কবার্তা চাপা পড়ে। আধুনিক রাজনৈতিক আলোচনায় একে “echo chamber” বলা হয়—একটি পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমত প্রবেশ করতে পারে না।
রাজনৈতিক চিন্তাবিদ Hannah Arendt ক্ষমতার সঙ্গে সত্যের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন—যখন সত্যকে আড়াল করা হয় এবং আনুগত্যের প্রদর্শন টিকে থাকে, তখন শাসনব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। কারণ শাসকের সিদ্ধান্ত তখন বাস্তবতার ওপর নয়, বরং প্রশংসার প্রতিধ্বনির ওপর নির্ভরশীল হয়। এটি গণতন্ত্রের জন্য গভীর হুমকি। কারণ এতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রকৃত জনমত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাঁরা ভাবেন—সব ঠিক আছে, কারণ চারপাশে কেবল ফুল আর প্রশংসা।
নেতৃত্বের ট্র্যাজেডি: সুবিধা নেয় অন্যরা, দায় পড়ে নেতৃত্বের ওপর একজন রাজনীতিবিদকে দীর্ঘ সময় আন্দোলন, হামলা-মামলা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও জন সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে ওঠে আসতে হয়। তিনি মাঠের রাজনীতি বোঝেন, মানুষের প্রত্যাশা বোঝেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে যদি তাঁর চারপাশ ঘিরে ফেলে সুবিধাবাদী কর্মী ও মোসাহেবি আমলারা, তবে তিনি ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সুবিধাভোগীরা সাময়িক লাভ তোলে—টেন্ডার, পদ, প্রভাব, আর্থিক সুযোগ। কিন্তু যখন ব্যর্থতা বা জনঅসন্তোষ তৈরি হয়, তখন দায় বর্তায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপর। পটপরিবর্তনের সময় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খান মন্ত্রীরাই; কারণ চাটুকাররা তখন নতুন আশ্রয়ে চলে যান।
ইতিহাসে বহু উদাহরণ রয়েছে—ক্ষমতাসীনরা নিজেদের চারপাশের কৃত্রিম সমর্থন দেখে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনঅসন্তোষের দায় নেতৃত্বকেই বহন করতে হয়েছে। ফলে ফুলেল শুভেচ্ছা সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের জন্যই ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এটিও সত্য যে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাইলে এই সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে—প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে দিলে ব্যক্তিনির্ভর তোষামোদি আচরণ অনেকাংশে সীমিত করা সম্ভব।
গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও উত্তরণের প্রশ্ন:
গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচন নয়; বরং নির্বাচনের পরবর্তী জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য। যদি প্রশাসন রাজনৈতিক মোসাহেবির সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত হয়, তবে নীতিনির্ধারণে পেশাদারিত্ব হারায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়। উত্তরণের জন্য কয়েকটি দিক বিবেচ্য—
প্রথমত, রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত প্রকাশ্যভাবে তোষামোদি সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনে নিরপেক্ষতার সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে—পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রয়োগ জরুরি।
তৃতীয়ত, দলীয় কর্মীদের জন্য নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন প্রয়োজন, যাতে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ব্যক্তিস্বার্থের উপায় না হয়ে উঠে।
চতুর্থত, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সক্রিয় সমালোচনা গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
ফুলেল শুভেচ্ছা সংস্কৃতি কেবল রাজনৈতিক সৌজন্যের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার চারপাশে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য অর্থনীতি। এখানে ফুলের পাপড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকে লেনদেনের প্রতিশ্রুতি, আর সুবাসের আড়ালে জমে ওঠে নৈতিক অবক্ষয়। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু প্রতিপক্ষ নয়—বরং সেই প্রশংসা, যা সত্যকে ঢেকে রাখে।
গণতন্ত্র টিকে থাকে সত্যভাষণ, সমালোচনা গ্রহণ এবং নৈতিক দৃঢ়তার ওপর। ফুলের সুবাস যদি সত্যকে আড়াল করে দেয়, তবে সেই সুবাস শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্যই বিষ হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর।
